ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬, ৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মাত্র ৩০০ মিটার খননেই ফিরতে পারে মেঘনার হারানো সবুজ

  • প্রতিবেদক
  • আপডেটের সময়: ০৮:২১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৫
  • ১৩৬ সময় দেখুন

ইব্রাহিম খলিল

একটা সময় ছিল, যখন খাল মানে ছিল প্রাণের প্রবাহ। পানির স্রোতের সঙ্গে সঙ্গে বয়ে যেতো কৃষকের স্বস্তি, জমির উর্বরতা আর মাটির টানে গড়া গ্রামীণ জীবনের সহজ-সরল গল্প। কিন্তু সেই চিরচেনা চিত্র আজ কেবল স্মৃতি। জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টি, ভূমির অপরিকল্পিত ব্যবহার আর দায়িত্বশীলতা হারানো আমলাতন্ত্র, সব মিলিয়ে এখন দেশের বহু খালই যেন মৃত্যুপথযাত্রী। অথচ সামান্য উদ্যোগেই ফিরিয়ে আনা সম্ভব অনেক কিছু। তেমনই এক বাস্তবচিত্র দেখা যাচ্ছে কুমিল্লার মেঘনা উপজেলায়।

ওই উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের বিনোদপুর গ্রামের পাশ দিয়ে একসময় বয়ে যেত করিমাবাদ-হিজলতলী-দক্ষিণ কান্দি হয়ে সেননগর বাজার পর্যন্ত বিস্তৃত একটি প্রাকৃতিক খাল। কাঠালিয়া নদীর শাখা থেকে এই খাল এনে দিত কৃষি জমিতে প্রয়োজনীয় পানি, প্রাণ দিত শত শত বিঘা জমিকে। বর্ষার জল ধরে রাখত, আর শুকনো মৌসুমেও নদী থেকে ধীরে ধীরে পানি এসে মাটিকে রাখত সজীব। দক্ষিণকান্দি ও দড়িকান্দি গ্রামের মাঝখানে বিস্তৃত ঐতিহ্যবাহী বিলটি ছিল এই খালের ওপর নির্ভরশীল। এমনকি প্রাকৃতিক মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও খালটির গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।

কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে খনন না হওয়ায় খালটি আজ পলিতে ভরাট। কোথাও কোথাও খালচিহ্ন পর্যন্ত মুছে যেতে বসেছে। বর্ষায় পানি জমে জলাবদ্ধতা হয়, আর চৈত্র-বৈশাখে খালটি যেন এক মৃত নদীর শুষ্ক স্মৃতি। এমন পরিস্থিতিতে কৃষকদের চাষাবাদ এখন রীতিমতো লড়াই। বীজতলা তৈরি থেকে শুরু করে মূল সেচ ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়। কেউ কেউ পাম্প দিয়ে সেচ দেওয়ার চেষ্টা করলেও সেই ব্যয়ের ভার কৃষকের পক্ষে বহন করা সম্ভব হয় না। লাভ তো দূরের কথা, মূলধনই উঠে আসে না অধিকাংশ সময়।

তবে আশার কথা হচ্ছে, স্থানীয় কৃষকেরা নিজেরা পরিদর্শন করে স্থানীয় জলের গতি-প্রকৃতি বুঝে বলছেন, মাত্র ৩০০ মিটার খাল পুনঃখনন করলেই পানি প্রবাহ আবারও সচল হতে পারে। এটি যদি করা যায়, তবে পুরো এলাকার কৃষি ব্যবস্থায় আসবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। শুধু যে চাষাবাদে সুবিধা হবে তা-ই নয়, বরং প্রতিবছর বাড়বে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ, ফিরবে দেশীয় প্রজাতির মাছের উপস্থিতি, তৈরি হবে একটি প্রাকৃতিক জলাধার, যা জলাবদ্ধতা রোধেও কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

এমন বাস্তব ও প্রয়োগযোগ্য একটি উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে সরকারের কোনো বড় প্রকল্প বা বড় অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন নেই। উপজেলা প্রশাসন এবং কৃষি বিভাগ যৌথভাবে যদি একটি ক্ষুদ্র প্রকল্পের আওতায় এই খালটি খননের উদ্যোগ নেন, তবে উপকৃত হবেন শত শত কৃষক পরিবার, প্রাণ ফিরে পাবে এক বিশাল জনপদ। এটা শুধু একটি খাল খননের প্রশ্ন নয়, বরং এর সঙ্গে যুক্ত খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষির টেকসইতা এবং স্থানীয় অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন।

খালটিকে ঘিরে যে সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে, সেটি এখন আর অনুমানের জায়গায় নেই। এটি একটি পরীক্ষিত বাস্তবতা। খালটি একসময় কৃষকের জীবনকে বাঁচিয়ে রেখেছিল, এখনো পারবে, যদি সময় থাকতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সাহসী এবং দায়বদ্ধ সিদ্ধান্ত নেন।

আমরা দেখেছি, মাঠপর্যায়ে প্রশাসনের ছোট একটি পদক্ষেপও হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ভিত্তিপ্রস্তর। তাই এখনই সময়, দীর্ঘদিন অবহেলিত পড়ে থাকা এই খালটির ভবিষ্যৎ নিয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার। মাত্র ৩০০ মিটার খননের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা যেন আর না থাকে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতি জোরালো অনুরোধ, এই অঞ্চলের কৃষক যেন প্রকৃতির সেই পুরোনো আশীর্বাদ আবারও ফিরে পান।

কারণ সবুজ ফেরানো মানে শুধু ধান গজানো নয়, এটি মাটির টানে গড়ে ওঠা মানুষের সম্মান, টিকে থাকা এবং ভবিষ্যতের প্রশ্ন।

ট্যাগ :

18 / 5,000 আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

লেখক সম্পর্কে তথ্য

Admin

জনপ্রিয় পোস্ট

সোহরাওয়ার্দী কলেজে টিসি ভর্তিতে নিচ্ছে অতিরিক্ত টাকা, নেপথ্যে অফিস সহকারী ইব্রাহিম

মাত্র ৩০০ মিটার খননেই ফিরতে পারে মেঘনার হারানো সবুজ

আপডেটের সময়: ০৮:২১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৫

ইব্রাহিম খলিল

একটা সময় ছিল, যখন খাল মানে ছিল প্রাণের প্রবাহ। পানির স্রোতের সঙ্গে সঙ্গে বয়ে যেতো কৃষকের স্বস্তি, জমির উর্বরতা আর মাটির টানে গড়া গ্রামীণ জীবনের সহজ-সরল গল্প। কিন্তু সেই চিরচেনা চিত্র আজ কেবল স্মৃতি। জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টি, ভূমির অপরিকল্পিত ব্যবহার আর দায়িত্বশীলতা হারানো আমলাতন্ত্র, সব মিলিয়ে এখন দেশের বহু খালই যেন মৃত্যুপথযাত্রী। অথচ সামান্য উদ্যোগেই ফিরিয়ে আনা সম্ভব অনেক কিছু। তেমনই এক বাস্তবচিত্র দেখা যাচ্ছে কুমিল্লার মেঘনা উপজেলায়।

ওই উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের বিনোদপুর গ্রামের পাশ দিয়ে একসময় বয়ে যেত করিমাবাদ-হিজলতলী-দক্ষিণ কান্দি হয়ে সেননগর বাজার পর্যন্ত বিস্তৃত একটি প্রাকৃতিক খাল। কাঠালিয়া নদীর শাখা থেকে এই খাল এনে দিত কৃষি জমিতে প্রয়োজনীয় পানি, প্রাণ দিত শত শত বিঘা জমিকে। বর্ষার জল ধরে রাখত, আর শুকনো মৌসুমেও নদী থেকে ধীরে ধীরে পানি এসে মাটিকে রাখত সজীব। দক্ষিণকান্দি ও দড়িকান্দি গ্রামের মাঝখানে বিস্তৃত ঐতিহ্যবাহী বিলটি ছিল এই খালের ওপর নির্ভরশীল। এমনকি প্রাকৃতিক মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও খালটির গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।

কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে খনন না হওয়ায় খালটি আজ পলিতে ভরাট। কোথাও কোথাও খালচিহ্ন পর্যন্ত মুছে যেতে বসেছে। বর্ষায় পানি জমে জলাবদ্ধতা হয়, আর চৈত্র-বৈশাখে খালটি যেন এক মৃত নদীর শুষ্ক স্মৃতি। এমন পরিস্থিতিতে কৃষকদের চাষাবাদ এখন রীতিমতো লড়াই। বীজতলা তৈরি থেকে শুরু করে মূল সেচ ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়। কেউ কেউ পাম্প দিয়ে সেচ দেওয়ার চেষ্টা করলেও সেই ব্যয়ের ভার কৃষকের পক্ষে বহন করা সম্ভব হয় না। লাভ তো দূরের কথা, মূলধনই উঠে আসে না অধিকাংশ সময়।

তবে আশার কথা হচ্ছে, স্থানীয় কৃষকেরা নিজেরা পরিদর্শন করে স্থানীয় জলের গতি-প্রকৃতি বুঝে বলছেন, মাত্র ৩০০ মিটার খাল পুনঃখনন করলেই পানি প্রবাহ আবারও সচল হতে পারে। এটি যদি করা যায়, তবে পুরো এলাকার কৃষি ব্যবস্থায় আসবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। শুধু যে চাষাবাদে সুবিধা হবে তা-ই নয়, বরং প্রতিবছর বাড়বে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ, ফিরবে দেশীয় প্রজাতির মাছের উপস্থিতি, তৈরি হবে একটি প্রাকৃতিক জলাধার, যা জলাবদ্ধতা রোধেও কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

এমন বাস্তব ও প্রয়োগযোগ্য একটি উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে সরকারের কোনো বড় প্রকল্প বা বড় অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন নেই। উপজেলা প্রশাসন এবং কৃষি বিভাগ যৌথভাবে যদি একটি ক্ষুদ্র প্রকল্পের আওতায় এই খালটি খননের উদ্যোগ নেন, তবে উপকৃত হবেন শত শত কৃষক পরিবার, প্রাণ ফিরে পাবে এক বিশাল জনপদ। এটা শুধু একটি খাল খননের প্রশ্ন নয়, বরং এর সঙ্গে যুক্ত খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষির টেকসইতা এবং স্থানীয় অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন।

খালটিকে ঘিরে যে সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে, সেটি এখন আর অনুমানের জায়গায় নেই। এটি একটি পরীক্ষিত বাস্তবতা। খালটি একসময় কৃষকের জীবনকে বাঁচিয়ে রেখেছিল, এখনো পারবে, যদি সময় থাকতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সাহসী এবং দায়বদ্ধ সিদ্ধান্ত নেন।

আমরা দেখেছি, মাঠপর্যায়ে প্রশাসনের ছোট একটি পদক্ষেপও হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ভিত্তিপ্রস্তর। তাই এখনই সময়, দীর্ঘদিন অবহেলিত পড়ে থাকা এই খালটির ভবিষ্যৎ নিয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার। মাত্র ৩০০ মিটার খননের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা যেন আর না থাকে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতি জোরালো অনুরোধ, এই অঞ্চলের কৃষক যেন প্রকৃতির সেই পুরোনো আশীর্বাদ আবারও ফিরে পান।

কারণ সবুজ ফেরানো মানে শুধু ধান গজানো নয়, এটি মাটির টানে গড়ে ওঠা মানুষের সম্মান, টিকে থাকা এবং ভবিষ্যতের প্রশ্ন।