ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬, ৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তিস্তা পাড়ে তামাক চাষ : কৃষকের জীবিকা নাকি পরিবেশের হুমকি?

  • প্রতিবেদক
  • আপডেটের সময়: ০১:১৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৫
  • ১৮৯ সময় দেখুন

একটি জমিতে চাষ করা হচ্ছে তামাক। ছবি: ইন্টারনেট

মো. আব্দুল্লাহ আল মুজাহিদ

বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গ, বিশেষ করে তিস্তা নদীর তীরবর্তী এলাকা দীর্ঘদিন ধরে তামাক চাষের জন্য পরিচিত। এই অঞ্চলে তামাক চাষের ইতিহাস বেশ পুরনো। কৃষকরা প্রজন্ম ধরে এই ফসল চাষ করে আসছেন। তামাক চাষের মাধ্যমে তারা তাদের পরিবারের ভরণপোষণ করেন। তিস্তা নদীর তীরবর্তী এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার সাথে তামাক চাষের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। অনেক কৃষকের কাছে তামাকই প্রধান আয়ের উৎস। এছাড়াও তামাক চাষে তুলনামূলকভাবে সেচের পরিমাণ কম লাগে তাই খরা প্রবল এই অঞ্চলে তামাক চাষ তুলনামূলক সহজ। তামাক একটি শীতকালীন ফসল। শীত মৌসুমে তিস্তায় অনেক অনেক চর পরায় এই অঞ্চলের কৃষকরা তামাক চাষের সময়ে মুলত আবাদি জমি ফিরে পায়।

তিস্তা পাড়ে তামাক চাষ
তিস্তা নদীর পাড় ঘেঁষে রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও আশেপাশের এলাকার কৃষকরা দিন দিন তামাক চাষের দিকে ঝুঁকছেন। নদীর তীরবর্তী বেলে-দোআঁশ মাটি তামাক চাষের জন্য বেশ উপযোগী। বড় বড় তামাক কোম্পানিগুলোর উৎসাহ ও সহায়তায় কৃষকরা ধান বা অন্যান্য শস্য বাদ দিয়ে তামাক চাষে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।

যেভাবে কৃষকের জীবিকার সাথে সংশ্লিষ্ট
তিস্তা নদীর তীরবর্তী এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার সাথে তামাক চাষের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। অনেক কৃষকের কাছে তামাকই প্রধান আয়ের উৎস। তামাক চাষ বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৃষি কার্যক্রম হিসেবে বিবেচিত। এটি মূলত অর্থকরী ফসল হিসেবে পরিচিত, কারণ তামাক থেকে কৃষকরা সরাসরি নগদ অর্থ উপার্জন করতে পারেন। তবে তামাক চাষের সঙ্গে জীবিকা নির্বাহের যে সম্পর্ক তা বোঝার জন্য কিছু বিষয় বিশ্লেষণ করা জরুরি। যথা-
১. বেশি লাভ: তামাক চাষ অন্যান্য ফসলের তুলনায় সাধারণত বেশি লাভজনক। বিভিন্ন কৃষকদের কথা বলে জানা গেছে তামাক চাষে তুলনা মুলক ভাবে অনন্য ফসলের চেয়ে সেচে, পরিচর্যা, সার কিট-নাশক কম ব্যাবহৃত হয়। তাই তারা তামার চাষে আগ্রহী।

২. বাজারজাতকরণে সুবিধা: তামাক কোম্পানিগুলো কৃষকদের কাছ থেকে সরাসারি তামাক কিনে নেয়, ফলে বাজারের সমস্যা হয় না। এছাড়াও এই অঞ্চলের বিভিন্ন হাটে তামাকের একটি বিশাল বাজার বিদ্যমান। প্রজন্ম ধরে তামাক চাষ করে আসার কারণে এটি তাদের জীবনযাত্রার একটি অংশ হয়ে উঠেছে। তামাক চাষিরা তাদের উৎপাদিত তামাক স্থানীয় ব্যবসায়ী বা তামাক কোম্পানির কাছে বিক্রি করেন। এই ব্যবসায়ীরা তামাককে প্রক্রিয়াজাত করে বড় বড় তামাক কোম্পানিতে পাঠান।

৩. কোম্পানির সহায়তা: তামাক কোম্পানিগুলো কৃষকদের ঋণ, সার, বীজ, এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করে। এর ফলে কৃষকরা সহজেই তামাক চাষে আগ্রহী হন এবং জীবিকা নির্বাহের জন্য এটি বেছে নেন।

৪. কর্মসংস্থান সৃষ্টি: তামাক চাষে জমি প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে ফসল তোলা এবং শুকানোর কাজ পর্যন্ত প্রচুর শ্রমিক প্রয়োজন হয়। ফলে এটি কৃষি শ্রমিকদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে।

যা বলছেন একজন তামাক চাষী
নাম: জগদীশ রায়
তামাক চাষ করেন: ১৯৮২ সাল থেকে
এবার চাষ করেছেন : ৮৪ শতাংশ

আমন ও আউশ এর মাঝেই তামাক চাষ করা যায়, আমন তুলে অগ্রহায়ন মাসে তামাক লাগাই ফাল্গুন মাসে তামাক তুলি, তামাক তুলে হাইব্রিড ইরি ধান লাগাই, ধানও হয় ১৫-১৬ মন। (তামাক চাষে অতিরিক্ত আয় হয়) বিভিন্ন তামাক কোম্পানি সাথে চুক্তি করা থাকে, কোম্পানি থেকে বীজ ফ্রি সরবরাহ করে। বিক্রির সময় তারা সারের দাম কেটে নেয়ার শর্তে সার সরবারহ করে, তামাক শুকানোর সময় পলিথিন সরবারহ করে।

তামাক পাতা শুকানোর কাজে ব্যস্ত চাষিরা। ছবি: ইন্টারনেট।
তামাক চাষে প্রতি শতাংশে খরেচ হয় ৬৫০ থেকে ৬৭০ টাকা। প্রতি শতাংশে উৎপাদন হয় ১০ থেকে ১২ কেজি। এক কেজি তামাক বিক্রি করি ১৫০ থেকে ২০০ টাকায়। প্রতি শতাংশে আমাদের লাভ থাকে প্রায় ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা। একই জমিতে তামাকের পরিবর্তে অন্য ফসল চাষ করলে আমাদের খরচও বেশি হয় আবার তেমন লাভ আমরা করতে পারি না। অল্প সময়ের মধ্যে ঘরে তোলা যায়। এছাড়া অনন্য ফসলের তুলনায় তামাক চাষে পানির পরিমাণ অনেক কম লাগে তাই আমাদের খরচ ও পরিশ্রম দুইটাই কম হয়।

আমরা জানি তামাক চাষ করা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। এখন আমাদেরও আসলে তেমন কিছু করার নাই। তামাক চাষের কারণে আমাদেরও অনেক ক্ষতি হয়। আমাদের এলাকা এমনিতেই অনেক গরীব। এখন পরিবেশের কথা চিন্তা করলে তো আমাদের পেট চলবে না। এখন তো আর আগের মতো তামাক চাষ হয় না। তবে সরকার যদি আমাদের পাশে থাকে তাহলে আমরাও এদিক থেকে সরে আসতে পারবো।

যেভাবে পরিবেশের জন্য হুমকি
তামাক বিভিন্নভাবে পরিবেশের ক্ষতি করে। এর উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাত করণ সবকিছুই পরিবেশের জন্য হুমকি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো হলো:
১. বন উজাড় ও জমির ক্ষতি: তামাক চাষের জন্য নতুন জমি তৈরির প্রয়োজন হয়, যা বনভূমি কেটে করা হয়। এর ফলে জীববৈচিত্র্যের ধ্বংস, কার্বন শোষণের ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং জলবায়ুর ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়।

২. মাটির উর্বরতা হ্রাস: তামাক চাষে মাটি থেকে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টি শোষিত হয়, যেমন নাইট্রোজেন, ফসফরাস, এবং পটাশিয়াম। এর ফলে মাটি দ্রুত উর্বরতা হারায় এবং অন্য ফসল চাষে অক্ষম হয়ে পড়ে।

৩. পানি দূষণ: তামাক চাষে ব্যবহৃত কীটনাশক, রাসায়নিক সার, এবং আগাছা দমনের ওষুধ বৃষ্টির মাধ্যমে নদী ও পুকুরে মিশে যায়। এগুলো জলজ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংস করে এবং মানুষের জন্য পানীয় জল দূষিত করে।

৪. বায়ু দূষণ: তামাক প্রক্রিয়াকরণের সময় প্রচুর পরিমাণে কাঠ পোড়ানো হয়। এই পদ্ধতিতে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইড ও অন্যান্য ক্ষতিকর গ্যাস নিঃসরণ হয়, যা পরিবেশ দূষণের একটি বড় কারণ।

৬. প্লাস্টিক দূষণ: তামাকজাত পণ্য, বিশেষ করে সিগারেটের ফিল্টার, প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি। এই ফিল্টার গুলি প্রায়শই পরিবেশে ফেলে দেওয়া হয়, যা মাটিতে ও পানিতে অক্ষয় দূষণ সৃষ্টি করে। এসব পণ্য আবার পুরোপুরি মাটির সাথে মিশে যায় না। ফলে পরিবেশে বিপর্যয় নেমে আসে।

আইনে যা বলা আছে:
বাংলাদেশে তামাক চাষ এবং তার নিয়ন্ত্রণের জন্য বেশ কিছু আইন এবং নীতি রয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো তামাকজাত পণ্যের উৎপাদন, বিপণন, এবং ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা, পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ এ বলা আছে, তামাকজাত দ্রব্য উৎপাদন ও উহার ব্যবহার ক্রমাগত নিরুৎসাহিত করিবার জন্য উদ্বুদ্ধ, এবং তামাকজাত সামগ্রীর শিল্প স্থাপন, তামাক জাতীয় ফসল উৎপাদন ও চাষ নিরুৎসাহিত, করিবার লক্ষ্যে সরকার প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন করিতে পারিবে।

তামাকজাত দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০৫ (সংশোধিত ২০১৩): এই আইনটি মূলত তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর হলেও এটি তামাক উৎপাদন এবং তার ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ। জনসাধারণের স্বাস্থ্য রক্ষার স্বার্থে তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন, প্রচার এবং পৃষ্ঠপোষকতা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মপরিকল্পনা (২০১৮-২০২৫): বাংলাদেশ সরকার ২০৪০ সালের মধ্যে দেশকে তামাকমুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তামাক চাষের জমির পরিমাণ হ্রাস এবং বিকল্প ফসল উৎপাদনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

তামাক চাষের বিধিনিষেধ: তামাক চাষের জন্য বনভূমি ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। কৃষকদের তামাক চাষের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতন করা হচ্ছে। তামাক চাষে প্রয়োজনীয় সরকারি প্রণোদনা সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে।

মানুষ কতটুকু সচেতন:
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ সালে দেশে তামাক পাতার উৎপাদন হেক্টরপ্রতি রেকর্ড করা হয় দুই দশমিক শূন্য চার টন, ২০২২-২৩ সালে যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুই দশমিক ৪৬ টনে। অর্থাৎ হেক্টরপ্রতি উৎপাদন বেড়েছে ২০ দশমিক ৫৮ শতাংশ। এর মানে তামাক চাষে মানুষকে নিরুৎসাহিত করা হলেও মানুষ আসলে খুব একটা সচেতন হচ্ছে না।

বিকল্প ব্যবস্থা
তামাক চাষ থেকে কৃষকদের পরিবেশবান্ধব ও লাভজনক বিকল্প চাষের দিকে উৎসাহিত করতে কয়েকটি কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তামাকের বদলে উচ্চমূল্যের অর্থকরী ফসল যেমন শাকসবজি, মসলা (হলুদ, আদা, রসুন), তেলবীজ (সরিষা, সয়াবিন), ডাল, অথবা ফলমূল (আম, পেয়ারা, লিচু) চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা যেতে পারে। তামাকের জমিতে গাছ লাগানো যেমন নারকেল, সুপারি, নিম, অর্জুন, তুলসী, ও অন্যান্য ঔষধি গাছ চাষের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষা এবং আয়ের উৎস তৈরি করা সম্ভব। জৈব সারের ব্যবহার করে সবজি বা ফলমূল উৎপাদন করলে তামাক চাষের তুলনায় অধিক লাভ পাওয়া যায়। এছাড়া অর্গানিক পণ্যগুলোর বাজারমূল্যও অনেক বেশি। কৃষকদের জন্য বিভিন্ন দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ, যেমন হস্তশিল্প, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কার্যক্রম (মধু চাষ, চামড়াজাত পণ্য তৈরি) বা গবাদিপশু পালন প্রকল্প চালু করা যেতে পারে।

পরিশেষ, উত্তরবঙ্গে তামাক চাষ একটি জটিল সমস্যা। একদিকে তামাক চাষ কৃষকদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করে, অন্যদিকে এটি মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। সুতরাং, এই সমস্যার সমাধানের জন্য সরকার, বেসরকারি সংস্থা এবং স্থানীয় জনগণের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।

ট্যাগ :

18 / 5,000 আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

লেখক সম্পর্কে তথ্য

Admin

জনপ্রিয় পোস্ট

সোহরাওয়ার্দী কলেজে টিসি ভর্তিতে নিচ্ছে অতিরিক্ত টাকা, নেপথ্যে অফিস সহকারী ইব্রাহিম

তিস্তা পাড়ে তামাক চাষ : কৃষকের জীবিকা নাকি পরিবেশের হুমকি?

আপডেটের সময়: ০১:১৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৫

মো. আব্দুল্লাহ আল মুজাহিদ

বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গ, বিশেষ করে তিস্তা নদীর তীরবর্তী এলাকা দীর্ঘদিন ধরে তামাক চাষের জন্য পরিচিত। এই অঞ্চলে তামাক চাষের ইতিহাস বেশ পুরনো। কৃষকরা প্রজন্ম ধরে এই ফসল চাষ করে আসছেন। তামাক চাষের মাধ্যমে তারা তাদের পরিবারের ভরণপোষণ করেন। তিস্তা নদীর তীরবর্তী এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার সাথে তামাক চাষের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। অনেক কৃষকের কাছে তামাকই প্রধান আয়ের উৎস। এছাড়াও তামাক চাষে তুলনামূলকভাবে সেচের পরিমাণ কম লাগে তাই খরা প্রবল এই অঞ্চলে তামাক চাষ তুলনামূলক সহজ। তামাক একটি শীতকালীন ফসল। শীত মৌসুমে তিস্তায় অনেক অনেক চর পরায় এই অঞ্চলের কৃষকরা তামাক চাষের সময়ে মুলত আবাদি জমি ফিরে পায়।

তিস্তা পাড়ে তামাক চাষ
তিস্তা নদীর পাড় ঘেঁষে রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও আশেপাশের এলাকার কৃষকরা দিন দিন তামাক চাষের দিকে ঝুঁকছেন। নদীর তীরবর্তী বেলে-দোআঁশ মাটি তামাক চাষের জন্য বেশ উপযোগী। বড় বড় তামাক কোম্পানিগুলোর উৎসাহ ও সহায়তায় কৃষকরা ধান বা অন্যান্য শস্য বাদ দিয়ে তামাক চাষে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।

যেভাবে কৃষকের জীবিকার সাথে সংশ্লিষ্ট
তিস্তা নদীর তীরবর্তী এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার সাথে তামাক চাষের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। অনেক কৃষকের কাছে তামাকই প্রধান আয়ের উৎস। তামাক চাষ বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৃষি কার্যক্রম হিসেবে বিবেচিত। এটি মূলত অর্থকরী ফসল হিসেবে পরিচিত, কারণ তামাক থেকে কৃষকরা সরাসরি নগদ অর্থ উপার্জন করতে পারেন। তবে তামাক চাষের সঙ্গে জীবিকা নির্বাহের যে সম্পর্ক তা বোঝার জন্য কিছু বিষয় বিশ্লেষণ করা জরুরি। যথা-
১. বেশি লাভ: তামাক চাষ অন্যান্য ফসলের তুলনায় সাধারণত বেশি লাভজনক। বিভিন্ন কৃষকদের কথা বলে জানা গেছে তামাক চাষে তুলনা মুলক ভাবে অনন্য ফসলের চেয়ে সেচে, পরিচর্যা, সার কিট-নাশক কম ব্যাবহৃত হয়। তাই তারা তামার চাষে আগ্রহী।

২. বাজারজাতকরণে সুবিধা: তামাক কোম্পানিগুলো কৃষকদের কাছ থেকে সরাসারি তামাক কিনে নেয়, ফলে বাজারের সমস্যা হয় না। এছাড়াও এই অঞ্চলের বিভিন্ন হাটে তামাকের একটি বিশাল বাজার বিদ্যমান। প্রজন্ম ধরে তামাক চাষ করে আসার কারণে এটি তাদের জীবনযাত্রার একটি অংশ হয়ে উঠেছে। তামাক চাষিরা তাদের উৎপাদিত তামাক স্থানীয় ব্যবসায়ী বা তামাক কোম্পানির কাছে বিক্রি করেন। এই ব্যবসায়ীরা তামাককে প্রক্রিয়াজাত করে বড় বড় তামাক কোম্পানিতে পাঠান।

৩. কোম্পানির সহায়তা: তামাক কোম্পানিগুলো কৃষকদের ঋণ, সার, বীজ, এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করে। এর ফলে কৃষকরা সহজেই তামাক চাষে আগ্রহী হন এবং জীবিকা নির্বাহের জন্য এটি বেছে নেন।

৪. কর্মসংস্থান সৃষ্টি: তামাক চাষে জমি প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে ফসল তোলা এবং শুকানোর কাজ পর্যন্ত প্রচুর শ্রমিক প্রয়োজন হয়। ফলে এটি কৃষি শ্রমিকদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে।

যা বলছেন একজন তামাক চাষী
নাম: জগদীশ রায়
তামাক চাষ করেন: ১৯৮২ সাল থেকে
এবার চাষ করেছেন : ৮৪ শতাংশ

আমন ও আউশ এর মাঝেই তামাক চাষ করা যায়, আমন তুলে অগ্রহায়ন মাসে তামাক লাগাই ফাল্গুন মাসে তামাক তুলি, তামাক তুলে হাইব্রিড ইরি ধান লাগাই, ধানও হয় ১৫-১৬ মন। (তামাক চাষে অতিরিক্ত আয় হয়) বিভিন্ন তামাক কোম্পানি সাথে চুক্তি করা থাকে, কোম্পানি থেকে বীজ ফ্রি সরবরাহ করে। বিক্রির সময় তারা সারের দাম কেটে নেয়ার শর্তে সার সরবারহ করে, তামাক শুকানোর সময় পলিথিন সরবারহ করে।

তামাক পাতা শুকানোর কাজে ব্যস্ত চাষিরা। ছবি: ইন্টারনেট।
তামাক চাষে প্রতি শতাংশে খরেচ হয় ৬৫০ থেকে ৬৭০ টাকা। প্রতি শতাংশে উৎপাদন হয় ১০ থেকে ১২ কেজি। এক কেজি তামাক বিক্রি করি ১৫০ থেকে ২০০ টাকায়। প্রতি শতাংশে আমাদের লাভ থাকে প্রায় ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা। একই জমিতে তামাকের পরিবর্তে অন্য ফসল চাষ করলে আমাদের খরচও বেশি হয় আবার তেমন লাভ আমরা করতে পারি না। অল্প সময়ের মধ্যে ঘরে তোলা যায়। এছাড়া অনন্য ফসলের তুলনায় তামাক চাষে পানির পরিমাণ অনেক কম লাগে তাই আমাদের খরচ ও পরিশ্রম দুইটাই কম হয়।

আমরা জানি তামাক চাষ করা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। এখন আমাদেরও আসলে তেমন কিছু করার নাই। তামাক চাষের কারণে আমাদেরও অনেক ক্ষতি হয়। আমাদের এলাকা এমনিতেই অনেক গরীব। এখন পরিবেশের কথা চিন্তা করলে তো আমাদের পেট চলবে না। এখন তো আর আগের মতো তামাক চাষ হয় না। তবে সরকার যদি আমাদের পাশে থাকে তাহলে আমরাও এদিক থেকে সরে আসতে পারবো।

যেভাবে পরিবেশের জন্য হুমকি
তামাক বিভিন্নভাবে পরিবেশের ক্ষতি করে। এর উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাত করণ সবকিছুই পরিবেশের জন্য হুমকি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো হলো:
১. বন উজাড় ও জমির ক্ষতি: তামাক চাষের জন্য নতুন জমি তৈরির প্রয়োজন হয়, যা বনভূমি কেটে করা হয়। এর ফলে জীববৈচিত্র্যের ধ্বংস, কার্বন শোষণের ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং জলবায়ুর ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়।

২. মাটির উর্বরতা হ্রাস: তামাক চাষে মাটি থেকে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টি শোষিত হয়, যেমন নাইট্রোজেন, ফসফরাস, এবং পটাশিয়াম। এর ফলে মাটি দ্রুত উর্বরতা হারায় এবং অন্য ফসল চাষে অক্ষম হয়ে পড়ে।

৩. পানি দূষণ: তামাক চাষে ব্যবহৃত কীটনাশক, রাসায়নিক সার, এবং আগাছা দমনের ওষুধ বৃষ্টির মাধ্যমে নদী ও পুকুরে মিশে যায়। এগুলো জলজ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংস করে এবং মানুষের জন্য পানীয় জল দূষিত করে।

৪. বায়ু দূষণ: তামাক প্রক্রিয়াকরণের সময় প্রচুর পরিমাণে কাঠ পোড়ানো হয়। এই পদ্ধতিতে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইড ও অন্যান্য ক্ষতিকর গ্যাস নিঃসরণ হয়, যা পরিবেশ দূষণের একটি বড় কারণ।

৬. প্লাস্টিক দূষণ: তামাকজাত পণ্য, বিশেষ করে সিগারেটের ফিল্টার, প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি। এই ফিল্টার গুলি প্রায়শই পরিবেশে ফেলে দেওয়া হয়, যা মাটিতে ও পানিতে অক্ষয় দূষণ সৃষ্টি করে। এসব পণ্য আবার পুরোপুরি মাটির সাথে মিশে যায় না। ফলে পরিবেশে বিপর্যয় নেমে আসে।

আইনে যা বলা আছে:
বাংলাদেশে তামাক চাষ এবং তার নিয়ন্ত্রণের জন্য বেশ কিছু আইন এবং নীতি রয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো তামাকজাত পণ্যের উৎপাদন, বিপণন, এবং ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা, পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ এ বলা আছে, তামাকজাত দ্রব্য উৎপাদন ও উহার ব্যবহার ক্রমাগত নিরুৎসাহিত করিবার জন্য উদ্বুদ্ধ, এবং তামাকজাত সামগ্রীর শিল্প স্থাপন, তামাক জাতীয় ফসল উৎপাদন ও চাষ নিরুৎসাহিত, করিবার লক্ষ্যে সরকার প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন করিতে পারিবে।

তামাকজাত দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০৫ (সংশোধিত ২০১৩): এই আইনটি মূলত তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর হলেও এটি তামাক উৎপাদন এবং তার ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ। জনসাধারণের স্বাস্থ্য রক্ষার স্বার্থে তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন, প্রচার এবং পৃষ্ঠপোষকতা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মপরিকল্পনা (২০১৮-২০২৫): বাংলাদেশ সরকার ২০৪০ সালের মধ্যে দেশকে তামাকমুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তামাক চাষের জমির পরিমাণ হ্রাস এবং বিকল্প ফসল উৎপাদনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

তামাক চাষের বিধিনিষেধ: তামাক চাষের জন্য বনভূমি ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। কৃষকদের তামাক চাষের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতন করা হচ্ছে। তামাক চাষে প্রয়োজনীয় সরকারি প্রণোদনা সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে।

মানুষ কতটুকু সচেতন:
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ সালে দেশে তামাক পাতার উৎপাদন হেক্টরপ্রতি রেকর্ড করা হয় দুই দশমিক শূন্য চার টন, ২০২২-২৩ সালে যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুই দশমিক ৪৬ টনে। অর্থাৎ হেক্টরপ্রতি উৎপাদন বেড়েছে ২০ দশমিক ৫৮ শতাংশ। এর মানে তামাক চাষে মানুষকে নিরুৎসাহিত করা হলেও মানুষ আসলে খুব একটা সচেতন হচ্ছে না।

বিকল্প ব্যবস্থা
তামাক চাষ থেকে কৃষকদের পরিবেশবান্ধব ও লাভজনক বিকল্প চাষের দিকে উৎসাহিত করতে কয়েকটি কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তামাকের বদলে উচ্চমূল্যের অর্থকরী ফসল যেমন শাকসবজি, মসলা (হলুদ, আদা, রসুন), তেলবীজ (সরিষা, সয়াবিন), ডাল, অথবা ফলমূল (আম, পেয়ারা, লিচু) চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা যেতে পারে। তামাকের জমিতে গাছ লাগানো যেমন নারকেল, সুপারি, নিম, অর্জুন, তুলসী, ও অন্যান্য ঔষধি গাছ চাষের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষা এবং আয়ের উৎস তৈরি করা সম্ভব। জৈব সারের ব্যবহার করে সবজি বা ফলমূল উৎপাদন করলে তামাক চাষের তুলনায় অধিক লাভ পাওয়া যায়। এছাড়া অর্গানিক পণ্যগুলোর বাজারমূল্যও অনেক বেশি। কৃষকদের জন্য বিভিন্ন দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ, যেমন হস্তশিল্প, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কার্যক্রম (মধু চাষ, চামড়াজাত পণ্য তৈরি) বা গবাদিপশু পালন প্রকল্প চালু করা যেতে পারে।

পরিশেষ, উত্তরবঙ্গে তামাক চাষ একটি জটিল সমস্যা। একদিকে তামাক চাষ কৃষকদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করে, অন্যদিকে এটি মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। সুতরাং, এই সমস্যার সমাধানের জন্য সরকার, বেসরকারি সংস্থা এবং স্থানীয় জনগণের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।